রোববার, ৩১ আগস্ট ২০২৫ , ১৫.ভাদ্র.১৪৩২

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:০২, ১৯ আগস্ট ২০২৫

আপডেট: ০১:০৩, ১৯ আগস্ট ২০২৫

রূফটপ সোলার, ছয় মাসে ৩০০০ মেগাওয়াট

উৎপাদন অসম্ভব: আইইইএফএ

উৎপাদন অসম্ভব: আইইইএফএ
ছবি : সংগৃহীত

জ্বালানি খাতের সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে (প্রায় ছয় মাসে) তিন হাজার মেগাওয়াট নতুন ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। তবে তা বাস্তবায়নে সময় ও সক্ষমতা বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)। গতকাল সোমবার আইইইএফএ দক্ষিণ এশিয়া কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন তৈরিতে করেন আইইইএফএ-এর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১৭ বছরে বাংলাদেশে মাত্র ২৪৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার ছাদ-ভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা অর্জনে পূর্বের তুলনায় ১২ গুণেরও বেশি দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

আইইইএফএ-এর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক এবং প্রতিবেদনের লেখক শফিকুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত অনুমোদিত লোড না থাকায় ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ অর্জন সম্ভব নয়। তাই টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এসব ভবনে ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই ও নথিভুক্ত করতে পারে । তিনি আরও বলেন, তহবিল বরাদ্দ, দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিসেম্বর ২০২৫-এর সময়সীমা বাড়ানো প্রয়োজন  হবে ।  

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে মাত্র ১৫/২০টি উচ্চমানের প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) কোম্পানি রয়েছে, যারা ছয় মাসের কম সময়ে ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে সক্ষম নাও হতে পারে। নতুন কর্মসূচির আওতায় সরকারি অফিসগুলো সরকারি তহবিলের সহায়তায় ক্যাপেক্স মডেলে ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করবে। অন্যদিকে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক ব্যয় ছাড়াই ওপেক্স মডেলে পরিচালিত হবে।  

উভয় মডেলের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, “ক্যা=পেক্স মডেলে দ্রুত বাস্তবায়ন ও আর্থিক সাশ্রয়ের সুযোগ বেশি থাকলেও সমন্বয়ে ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং তড়িঘড়ি করে ডেভেলপার নির্বাচনের কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ওপেক্স মডেল গুনগত মান নিশ্চিত করবে, তবে এতে সাশ্রয় কম হবে এবং গ্রামীণ এলাকায় অর্থায়নে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। লোডশেডিং এর সময় ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গ্রীডে সরবরাহ করা যাবে না বিধায় গ্রামীণ এলাকায় ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগের ঝুঁকি রয়েছে । ছোট ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রকল্পেও বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাতে পারেন।”   

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ধুলাবালি বা ময়লা জমার কারণে বার্ষিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তাই ক্যাপেক্স মডেলের আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মাসিক সঞ্চয় থেকে একটি তহবিল তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে । একইসাথে গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।  

এখানে উল্লেখ্য, ক্যাপেক্স মডেল বলতে সাধারণত বোঝায়, যেখানে একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য একজন ডেভলপার (যেমন একটি কোম্পানি) প্রাথমিক মূলধন বিনিয়োগ করে প্রকল্পটি স্থাপন করে। এই ক্ষেত্রে, প্রকল্পের মালিক (যেমন একটি কোম্পানি বা বাড়ির মালিক) ইনস্টলেশন, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহ সমস্ত খরচ বহন করে। অর্থাৎ, ক্যাপেক্স মডেল হল এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল যেখানে কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি একটি প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক মূলধন বিনিয়োগ করে এবং সেই প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করে। সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে, এটি মূলত সৌর প্যানেল স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগকে বোঝায়। 

আর ওপেক্স মডেল হচ্ছে একটি ব্যবসায়িক মডেল যেখানে একটি কোম্পানি বা ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি পরিষেবা বা পণ্যের ব্যবহারের জন্য অর্থ প্রদান করে, কিন্তু সেই পরিষেবা বা পণ্যের মালিকানা অর্জন করে না। ওপেক্স মডেলের মূল ধারণা হল, একটি বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ না করে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি পরিষেবা বা পণ্য ব্যবহার করা যায়। এটি বিশেষ করে সেইসব ক্ষেত্রে উপযোগী যেখানে একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ কেনার প্রয়োজন হয় না বা যেখানে প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল।

আইইইএফএ এর প্রতিবেদনে প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় বাস্তবায়িত এবং চলমান প্রকল্পগুলো থেকে অভিজ্ঞতা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এসব দেশে বিদ্যুৎ মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ৪৭ শতাঙশ থেকে ৬৩ শতাংশ। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ বিদ্যুতের ট্যারিফ ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে । শ্রীলঙ্কায় বহুপাক্ষিক সংস্থার ঋণ এ খাতে অর্থায়নের বাধা মোকাবিলায় সহায়তা করে । পরে সরকারি ভবনে ছাদ-ভিত্তিক বিদ্যুতের জন্য শ্রীলঙ্কার সরকার নিজস্ব তহবিল প্রদান করেছে। অন্যদিকে ভারতে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ছাদ-ভিত্তিক বিদ্যুতের সক্ষমতা ১৮,০০০ মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে, যা ধারাবাহিক নীতি ও সরকারি সহায়তার ফল।    

শফিকুল আলম জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে ছাদ-সৌর বিদ্যুৎ খাত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই কর্মসূচির সফলতার জন্য সরকারি সংস্থা ও অংশীজনদের সক্ষমতা উন্নয়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্বাধীন মনিটরিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে ।