বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসীদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
দলমত–নির্বিশেষে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতা নিয়ে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, যেসব সংস্কারের মাধ্যমে সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হবেন, সেগুলো বাস্তবায়নে বিএনপি যাতে সফল না হয়, সে জন্য একটি পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে সবার আন্তরিক সহযোগিতা, ধৈর্য ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বুধবার জাপানের টোকিওতে নিউ ওয়াজনি হোটেলে বাংলাদেশ কমিউনিটি জাপানের উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আজ দলমত–নির্বিশেষে সবার কাছে আমি একটা কথা বলব—আপনাদের মন থেকে সহযোগিতা যদি থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই আমাদের এই বাংলাদেশকে, আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। তবে এ জন্য আমাদের পরিশ্রম করতে হবে, ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং একসঙ্গে থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে জাপান বিনিয়োগ করেছে এবং দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করেছে। ভবিষ্যতে কীভাবে জাপান আরও নতুনভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে এবং দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে পারে, সে বিষয়ে দেশটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
প্রবাসীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নিয়ে আসতে সবাইকে কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিতে হবে। দেশে বিনিয়োগ হলে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যা একসময় দেশের সম্পদে পরিণত হবে। একই সঙ্গে দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতেও ধীরে ধীরে উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। প্রবাসীদের কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ অন্য পেশায় নিয়োজিত, আবার অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
প্রবাসীদের দেশের ‘অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে ব্যাপকভাবে জড়িত। দেশটির ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করছেন। তাই বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য কী কী সুবিধা তৈরি করা হয়েছে, তা জাপানের ব্যবসায়ী মহলের কাছে তুলে ধরতে পারেন প্রবাসীরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং দেশের ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরতে পারেন তাঁরা। এতে সরকার ও দেশ—উভয়ই উপকৃত হবে।
তারেক রহমান বলেন, আট মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণের সময় বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছিল। প্রশাসনের অবস্থাও ছিল নাজুক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এ ছাড়া দেশে আরও নানা ধরনের সমস্যা ছিল, যার কিছু এখনো রয়েছে। এসব সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেই সরকারকে সামনে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের উপযোগী করে ট্রাফিক আইন নিয়ে একটি বই তৈরি করা হয়েছে, যাতে তারা ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানতে পারে। অর্থাৎ সরকার বিস্তারিত ও বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হলে দেশের সন্তানরা শিক্ষিত হবে এবং তারাই আগামী দিনে দেশ গড়ে তুলবে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। অনেকে বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের কথা বললেও মানুষের জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমন সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে কতটুকু স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা, মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সেবাপ্রাপ্তি সহজ করাও সংস্কারের অংশ।
তারেক রহমান বলেন, ‘যে সংস্কারটা করলে দেশের মানুষ একটু হলেও ভালো স্বাস্থ্যসুবিধা পাবে, এর থেকে জরুরি সংস্কার আর কী হতে পারে এই মুহূর্তে?’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক রকম সংস্কারের কথা বলছেন, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, যে দুটো কথার কথা বললাম, এই দুটোই অনেকগুলো সংস্কারের মধ্যে এই মুহূর্তের জন্য জরুরি সংস্কার।’
একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সারাদেশ ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কার ক্ষমতা বাড়ল আর কার ক্ষমতা কমল, তার চেয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতের সংস্কার মানুষের কাছে বেশি প্রত্যাশিত।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখানে ব্যবসার বিনিয়োগের কথা বলেছি, ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য কি করা যেতে পারে পলিসি স্ট্রাকচারে। অর্থাৎ সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি বলেছি যে, আমাদের অন্যতম একটা মূল লক্ষ্য—যেটা আমরা নির্বাচনের আগেও বলেছিলাম, নির্বাচনের পরেও বলছি একই কথা—সেটি হচ্ছে যে, আমাদের যুব সমাজকে সুবিধা দেয়া এবং এই তরুণদেরকে জব দিতে হবে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমরা কোনো একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশের সন্তানরা, দেশের মানুষেরা, মা-বোনেরা, নারীরা সুস্থ থাকবে? এটাই আমার কাছে বড় সংস্কার মনে হয়। যদি আমরা টোকিওর মত ঢাকা শহরকে ক্লিন করতে পারি, জাপানের মতন বাংলাদেশকে...। যখন ছোট ছিলাম শুনতাম যে যেদিকে চোখ যায় বাংলাদেশে সবুজ আর সবুজ, শুনতাম না আমরা এরকম কথা? কিন্তু এখন কি আমরা সেটা শুনি? সেটা ঢাকা শহর হোক বা ঢাকা শহরের বাইরে গেলে হয়তো একটু-আধটু কিন্তু তারপরেও সেভাবে সবুজ আর চোখে পড়ে না।
অনুষ্ঠনে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সফরসঙ্গী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান বিষয়ক) ড. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিল প্রমুখ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে জাপান বিএনপির সভাপতি রেজী মীর, সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক মনি, প্রধান পৃষ্ঠপোষক এস ইসলাম নান্নু, সহসভাপতি মাসুম জাকির, দপ্তর সম্পাদক আবুল খায়ের ভূঁইয়া এবং ব্যবসায়ী নেতা কাজী সারওয়ার হাবিব (সিআইপি) উপস্থিত ছিলেন।
















