পাঁচ ব্যাংকে ৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই

একীভূতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মী ছাঁটাই না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এই প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরতদের চাকুরিচ্যুতি অব্যাহত রয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে গণহারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। এতে নিদারুণ কষ্ট ও জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা।
গত জুলাই মাসে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার ৫৫০ জন কর্মকর্তাকে পৃথক ই-মেইলের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেও তারা চাকরি ফেরত পাননি।
ভুক্তভোগী এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাবি করেছে, ২০২১ সাল থেকে ব্যাংকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসংগতি রয়েছে। কোনো ব্যাংক নিজেদের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি প্রকাশ করে না। অথচ এই ব্যাংক নিজেদের দোষ জনসমক্ষে প্রকাশ করছে।’
অপর একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘যদি আপনি আমাকে অবৈধ নিয়োগ বলে টার্মিনেট করেন, তাহলে আপনার পুরো অথরিটিকেই টার্মিনেট করতে হবে। কেননা, আমার ওই নিয়োগের সঙ্গে সে সময় আপনিও সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্পৃক্ত ছিল।’
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২১ সাল থেকে ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে বেশ কিছু অনিয়মের চর্চা হয়েছে। নতুন পর্ষদ যাচাই-বাছাই করে অযোগ্যদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছে বলেও দাবি করেছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসনের এই দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য তা ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫৭৯ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকেও (ইউসিবি) বেশ কিছু কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে অনেকের বাড়ি শুধু চট্টগ্রাম হওয়ার কারণেও নাম ছাঁটাইয়ের তালিকায় ওঠে। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পদের ৫৪৫ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পুনর্বহালের দাবিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেও সফল হননি। বর্তমানে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
এই বিষয়ে একজন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো বিধি অনুসরণ না করেই বিনা কারণে ৫৪৫ জনকে চাকরিচ্যুতির নোটিশ ধরিয়ে দেয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এটি কর্মচারীর সঙ্গে চরম অন্যায় ও অবিচারের শামিল। পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা খুব কষ্টে আছি।’
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ৫টি ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেসব ব্যাংকে নতুন করে ছাঁটাই আতঙ্ক শুরু হয়েছে। আতঙ্কে ভুগছেন বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাইয়ের নামে মূল্যায়ন পরীক্ষাসহ নানা কৌশল নিচ্ছে ব্যাংকগুলো।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে আবার নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকা করা হয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। যদিও এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, নতুন করে ছাঁটাইয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একীভূতকরণের যে কৌশল দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, একীভূত হওয়ার তিন বছরের মধ্যে কারও চাকরি যাবে না।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘অনেক ব্যাংকেই কর্মকর্তাদের ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পটপরিবর্তনের পর কর্মী ছাঁটাই করছে কিছু ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ। তবে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে কোনো ছাঁটাইয়ের ঘটনা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণের যে রূপরেখা দিয়েছে সেখানেও ছাঁটাইয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, একীভূতকরণের তিন বছরের মধ্যে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কর্মকর্তাদের ইচ্ছেমতো চাকরিচ্যুত করা যাবে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা এখনো বহাল আছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলো ব্যবস্থা নিতে পারবে। তবে বেছে বেছে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।